অশনি সংকেত ?

ইমরান আহমেদ চৌধুরীর কলাম : স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস, একুশে ফেব্রুয়ারী, বই মেলা, রথ যাত্রা, নববর্ষের সভা যাত্রা , মহররমের আশুরা মিছিল এই সব জাতীয় অনুষ্ঠান/দিবস গুলো পালন করা বাঙ্গালি জাতির এক অত্যন্ত প্রধান জাতিগত কর্তব্য । অনেক রক্ত, অনেক ত্যাগ, অনেক মা বোনের অশ্রু – রক্ত ভেজা আঁচল, লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনের বিনিময়ে পরাধীনতার শৃঙ্খল থেকে জাতি মুক্তি পেয়েছিল ১৯৭১ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর । এক ভগ্ন প্রায়, অর্থনৈতিক ভাবে বিপর্যস্ত, যোগাযোগ ব্যবস্থা বিচ্ছিন , জমিনে নেই রবিশস্য, গোলায় নাই কোন ধান, লাঙ্গল চাষ করার মত হালের গরুও নেই কৃষকের কাছে, ১ কোটির অধিক ভারত প্রত্যাগত রিফ্যুজি, টেলিফোন বিকল, ব্যাঙ্ক গুলো কপর্দকহীন এই দিয়েই শুরু হয়েছিল বাংলাদেশের – হাঁটি হাঁটি পা পা করে আজ কোথায় বাংলাদেশ । উন্নয়নের সোপানের একাকী পথযাত্রী সমগ্র বাংলাদেশ । দেউলিয়া করে দিয়ে বাংলার মানুষের সকল অর্থ, সম্পদ, মূল্যবান সব লুট করে সর্বস্বান্ত করে দিয়েছিল সেই কুখ্যাত পাকিস্তানী বাহিনী এবং তাদের জারজ সন্তান বিভিন্ন ধর্মীও মতাব্বালম্বী রাজনৈতিক দল গুলো – যারা তাদের নিজেদের মা ও বোন দের তুলে দিয়েছিল সেই বর্বর পাকিস্তানী আগ্রাসী বাহিনীর হাতে – যারা তাদের ধর্ম ভাই হিসেবে বিবেচনা করত ঐ নিষ্ঠুর, পাপী, অত্যাচারী, কুলাঙ্গার মসুল্মান নামের কলঙ্ক পাকিস্তানী এবং বাঙ্গালির অনাদি কাল অব্দি জাত শত্রু পাঞ্জাবি দের । কি বিচিত্র এই পৃথিবী ।

তাই তো আজ থেকে ২০৫৫ বছর আগে দিকবিজয়ী অ্যালেক্সান্ডার আক্ষেপে বলেছিল তার বাল্য বন্ধু কে , ‘’ কি বিচিত্র এ দেশ, সেলুকাস ” । আসলেই বাংলাদেশের কতিপয় ধর্মীয় পতাকার ছত্রছায়ায় গজে উঠা এই অবাঞ্ছিত তথাকথিত দল বাংলাদেশ স্বাধীনতার সংগ্রামে যেমনি করে বিরোধিতা করেছিল ঠিক তেমনি ভাবে স্বাধীনতার পর থেকে আবার যখন ঐ মানুষ নামের পশু গুলো মাঠে আসলো সেই থেকেই অবমাননা করতে তাখলো স্বাধীনতার কৃষ্টি, আমাদের স্বাধীনতার ত্যাগ, আমাদের মা বোনদের সেই জঘন্য নাক্যারজনক অধ্যায় কে অস্বীকার করতেও ওরা দ্বিধাবোধ করে নাই ওরা – সামরিক জান্তা এবং পাকিস্তান এবং মধ্য প্রাচ্যের কয়েকটি ওগনতান্ত্রিক বিভিন্ন মতাবলম্বী দল এর সহযোগিতায় আবার এরা পুনর্বাসিত হয় স্বাধীন বাংলাদেশে । শুরু করে ওদের সেই মরণ খেলা – চালু করে এক নতুন ধর্মীয় রীতিনীতি প্রচার । শাশ্বতকাল যাবত প্রচারিত এবং অনুশীলন করা আমাদের দেশের ঐতিহ্য বাহী সুফি ইসলাম কে এরা বদলে দিয়ে উগ্র, উদ্ভট, পশ্চাৎ পদ হাঁটা স্বরূপ এক নতুন ধর্মীয় আচার আচরণ, পোশাক, ভাষা, চালচলন এক একাগ্র চেষ্টা করতে থাকে ।

আর রাজনীতির নামে আনতে চেষ্টা করে ধর্মগ্রন্থের ভুল বা মনগড়া সব অনুবাদ এবং মানুষের ধর্মান্ধতাকে নিজেদের রাজনৈতিক এবং সদ্য স্বাধীনতা প্রাপ্ত দেশ টাকে ঐ গুষ্টি ক্রমান্বয়ে অচল এবং ধর্মের নামে গোঁড়া জনগোষ্ঠী বানাতে উঠে পরে লাগে সেই ১৯৭৬ – ৭৭ সাল থেকে । গড়ে তুলে এক চেষ্টা করতে থাকে এক নতুন মরণখেলা ; হাজার হাজার স্কুল কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র – ছাত্রীদের কে করতে শুরু করে ওদের মনগড়া গোঁড়া ধর্মান্ধ বানানোর মগজ ধোলাই । শুরু করে ধর্মের নামে রাজনীতি – অরাজকাতা, ধর্মান্ধতায় অন্ধ যুবক এবং ছাত্র শ্রেণিকে ব্যাবহার করতে থাকে এদের অপরিপক্ক দেশ এর জনগণ দের বিভক্ত করার এক অপপ্রয়াশ ।হাজার হাজার নিরীহ ধর্মপ্রাণ যুবক রা আত্মাহুতি দেয় এদের এই নতুন ক্ষমতা গ্রহণের অভিপ্রায়ের চেষ্টায় । গড়ে তুলে বিদেশের পরাশক্তির আর্থিক সহায়তায় স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, ধর্মীয় উপাসনালয় এবং দেশের ধর্মপ্রাণ বিশাল জনগোস্টির চোখে ধুলা দিয়ে । এদের ঐ রাজনৈতিক দলের অস্ত্রধারী পদালী (ক্যাডার ) সৃষ্টি করে এক ত্রাসের রাজত্ব , বিভিন্ন কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয় গুলোতে ।

জনগণ ওদের কুড়াল আর চাপাতির ভয়ে থাকত এক সময় ভীত সন্ত্রস্থ । বিদ্যাপীঠ গুলোতে নারী ছাত্রীরা থাকত সকল সময় শঙ্কিত । অপর পক্ষের ভিন্ন মতাবিলম্বিদের কর্ণ কেটে দেওয়া এবং ওদের বিরোধিতাকারিদের হস্ত কর্তন করে করে এরা উঠে হয়ে এক বেপরোয়া সন্ত্রাসী – প্রতিপন্ন এক লোমহর্ষক জঙ্গি দলে ; ওদের উম্মাদনায় ক্রমান্বয়ে এরা করতে থাকে এবং দেখাতে থাকে আমাদের জাতীয় সকল অনুষ্ঠানের প্রতি উন্নাসিকতা অত্যন্ত আক্রমণাত্মক ভাবে । দিনে দিনে এরা দলে ভারী হতে থাকে পয়সার বিনিময়ে এদের পদালি ( ক্যাডার) সংখ্যা বাড়াতে থাকে বাংলার গ্রামে, গঞ্জে, শহরে ও বন্দরে । এদের দলের সকল রাজনৈতিক সদস্যদের কে এদের ভাবাদর্শগত নেতারা ক্রমান্বয়ে বেতন ভুক্ত শ্রমিক বা কর্মচারী রে রুপান্তারিত করে ফেলে ওদের অজান্তে ।

আদেশের বাহক এবং আদেশের জল্লাদে । সকল কর্মকাণ্ডকে স্ববিস্লেশিত ধর্মের অনুবাদের মোড়কে মুড়িয়ে দিয়ে ঐ সব নিরীহ যুবকদের মগজধোলাইয়ের মাধ্যমে সকল কর্মকাণ্ডকে পবিত্র কর্তব্য বানিয়ে ফেলে চোখের পলকে । আর নিরদ্ধিধায় প্রাণ হারায় হাজার হাজার কর্মী নামের বেতন ভুক্ত কর্মচারীরা – স্বপ্নে বিভোর পরজগতের প্ররোচনার প্রলাপে । যেন এক বিষবৃক্ষ । হত্যা, খুন, নির্মম ভাবে শরীরের বিভিন্ন অবয়ব বিচ্ছিন্ন করার এক কসাই তে রুপান্তারিত এই তথাকথিত দলটি বা দল গুলো – এরা ক্রমান্বয়ে অনুপ্রেবশ করতে থাকে দেশের সকল পেষায় সন্তর্পণে, নিভৃতে, নীরবে গুটি গুটি পায়ে – যদিও সাফল্য অনেক অনুবক্ষনিক আপাতঃ দৃষ্টিতে । আর শুরু করে এদের নীচ প্রচারানা – সৃষ্টি করতে থাকে বিভাজন, শ্রেণি বিভেদ, পেশা বিভাজন এবং অসংযোগ আর অদ্রবণীয় মিশ্রণ পরিণীত করতে থাকে সমাজকে , দেশেকে এবং আন্তর্জাতিক পরিধিতে অভিবাসী সম্প্রদায় দের কে ও । এদের সৃষ্ট বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান উভয় সাধারণ এবং ধর্মীয় থেকেই শুরু করে এরা আমাদের হাজার বছর পুরনো সামাজিক আদব কায়দা, চাল চলন, সামাজিক অনুশাসন এবং পোশাক আসাক এর কৃষ্টি কে ক্রমান্বয়ে বদলে দিতে থাকে দিন দিন ।

বাঙ্গালিত্বের দ্রবণ টা আস্তে আস্তে ঘনত্ব লঘু হতে শুরু করে । বিদেশি অপশক্তির বলয়ে নিজেদের কে ওতপ্রোত ভাবে এতোই সন্নিবেশিত করে ফেলে যে, ওদের আদেশে এরা শুরু করে ওদের মন্ত্রের মন্ত্রণা আর অবমাননা উন্নাসিকতা এবং নিগ্রিহ করতে থাকে আমাদের লক্ষ লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে স্বাধীনতা যুদ্ধ এবং পাকিস্তানের গোলামির প্রতিবাদে আমাদের ২৪ বছরের সংগ্রামের বিভিন্ন মাইল ফলক ঘটনা গুলোর উদযাপন অনুষ্ঠান গুলোকে ।

ওদের প্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ( সাধারণ এবং ধর্মীয়) প্রতিষ্ঠানে চালু করে এক ভিন্ন রীতিনীতি – আমাদের জাতীয় সঙ্গীতে অনীহা, দেশের আপামর জনগণ এর সমষ্টিগতভাবে উদযাপিত অনুষ্ঠানে যোগদানের অনিচ্ছা । এ যেন দেশের অভ্যন্তরে এক অচিন লোকালয় বা জনগোস্টি ।

প্রতিনিয়ত মিথ্যা প্রচারণার মধ্যে দিয়ে নারী দের কে ক্রমান্বয়ে কর্ম বিমুখ করে তোলার চেষ্টা এবং অপরিকল্পিত পরিবার গড়ে তোলার মাধ্যমে নারী কুলদের পড়াশুনা, আত্মউন্নয়ন, এবং বন্ধনমুক্তি বিলম্বিত করার চেষ্টা আর এর সাথে নারী সমাজ কে ক্ষমতায়ন করার উদ্যোগকে নাকচ করার প্রয়াসেও এরা পিছিয়ে ছিল না । মধ্যপ্রাচ্য এবং আফ্রিকান কয়েকটি দেশে এবং কয়েকটি নিষিদ্ধ উগ্রপন্থী দলের দেওয়া পয়সা দিয়ে এরা গড়ে তুলে আমাদের দেশে এক বিশাল ব্যবসা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ব্যাঙ্ক এবং অন্যান্য ব্যাবসা যে সবের লভ্যাংশ দিয়ে অবতারণা করে দেশ ব্যাপী একটি বিশাল ধূসর অর্থনীতি এবং এদের প্রতিষ্ঠানে শিক্ষাপ্রাপ্ত রা কোনদিনই কোন মূলধারার সোসাইটির সাথে সংপৃক্ত হয় নি বা হতে দেখা যায় নি এবং দেশের আয়কর এর আওতায় কখনোই আসে নাই এরা কেবলধূসর কিংবা কালো অর্থনীতিতেই সন্নিবেশিত ছিল সকল সময় , একি সাথে এরা কোন প্রকার সাদা কলার চাকরিতেও যোগদানে করেনি তেমনটি – সব সময় কেমন যেন দাঁড়িয়ে থেকেছে সামাজিক, সাংস্কৃতিক এবং দেশজ কর্মকাণ্ডের নৈতিক বর্ণালী বেড়ার অপর পাড়ে ।

দেশটাকে অচল এবং জনগণ কে ধর্মের নামে অথর্ব বানানোর সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থতায় পর্যবসিত প্রায় ।পাপে ছারে না বাপকেও বাংলায় একটা কথা আছে । ৪০ বছরের অপরাজনিতি এদের দিয়েছে মাত্র ৪.৬% ভোট ব্যাঙ্ক । আগামী ১০০ বছরেও এরা ১০% ভোট পাবে বলে আপাতঃ দৃষ্টিতে মনে হয় না । অগনতান্ত্রিল্ক পথে দেশের ক্ষমতায় আসার সে গুড়ে বালি । নিবন্ধন সমস্যা এবং অতীত কর্মকাণ্ডের কারণে দেশের শিক্ষিত, পেশাদারী, ধর্মনিরপেক্ষ জনগণ এদেরকে সম্পূর্ণভাবে প্রত্যাখ্যান করেছে তাই মনে হচ্ছে নতুন ফন্দি এঁটেছে এর আবার ।

বইমেলায় নামাজ

নব্য ফন্দি হলো এই , যে সব কাজে – উদযাপনে , অনুষ্ঠানে, মেলায় এরা কখনোই যোগদানে অনীহা প্রকাশ করত আজ এদের দেখা যাচ্ছে বই মেলায় , পহেলা বৈশাখে, একুশের বেদি, বিজয় দিবসে, স্বাধীনতা দিবসের অনুষ্ঠানে । এক নীরব প্রচেষ্টা আবার চালাচ্ছে কি এরা এই সব অনুষ্ঠান গুলোকে ওদের মনগড়া ধর্মীয় মোড়কের পলেস্তরায় আচ্ছাদন করতে নাকি পর্দার অন্তরালে, কিংবা আল্লখেল্লার আস্তিনে লুক্কায়িত আছে কোন বিষমাখা খজর ?

একদিন যেসব আপামর জনগণ সমাদৃত জাতীয় সত্তা বাহক কর্মকাণ্ডে যাদের ছিল এতো ঘৃণা, উন্নাসিকতা, অবমাননা তারা কেন আজ দল বেধে ঐ সব অনুষ্ঠানে অযাচিত, উচ্ছিস্ট, অর্বাচীন, অনাদৃত কাফেলার সিপাই হিসেবে দলে দলে প্রবেশের পায়তারা করছে ?

এ প্রশ্ন আজ সবার । জাতি আজ জানতে চায় কি এর পিছনে ? কি দুরভিসন্ধি লুক্কায়িত আছে ? এটা কি আরেকটা অশনি সঙ্কেত ?

ইমরান আহমেদ চৌধুরী, যুক্তরাজ্য ।
লেখক – কলামিস্ট – রাজনৈতিক বিশ্লেষক

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

error: Content is protected !!