ফ্রান্সে আটকা পড়া বিদেশি নাগরিককে উদ্ধার করে প্রসংশিত বাংলাদেশি আইনজীবী সজিব হোসেন

নিউজ ডেস্ক : ৪৮ বছর বয়সী আবদুলি জোবে মূলত যুক্তরাজ্যের স্থায়ী নাগরিক। কিন্তু এখন থেকে দুই সপ্তাহ আগে নিজের নাগরিকত্বের প্রমাণপত্র (রেসিডেন্স কার্ড) হারিয়ে ফেলেন। আর এ কারণেই ফ্রান্সের প্যারিসের চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরে আটকা পড়েন তিনি।

তবে দ্য টার্মিনাল সিনেমার টম হ্যাঙ্কসের মতো দুর্ভাগ্যক্রমে আটকা পড়েননি, আবদুলি জোবে আটকা পড়েন অন্য কারণে। রেসিডেন্স কার্ড না থাকায় তাকে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেয়া হয়নি।

ফলে প্রায় দুই সপ্তাহ ধরে চার্লস দ্য গল বিমানবন্দরের ভেতরেই অবস্থান করতে বাধ্য হন আবদুলি জোবে। আর সেখানে রীতিমতো এক দুঃস্বপ্নের মধ্যদিয়ে যান তিনি। বিমানবন্দরের কর্মীরা জানিয়েছেন, এ দুই সপ্তাহ প্রায় না খেয়েই কেটেছে আবদুলির। ক্ষুধা লাগলে টয়লেটের ট্যাপ থেকে পানি পান করতেন। আর রাত হলে বিমানবন্দরের লাউঞ্জের ঠান্ডা মেঝেতেই ঘুমাতেন।

যুক্তরাজ্যের স্থায়ী নাগরিক আবদুলির নিজের জন্মস্থান আফ্রিকার গাম্বিয়া। সম্প্রতি সেখানেই নিজের পরিবারের কাছে বেড়াতে যান তিনি। কয়েকদিন পর আবারও যুক্তরাজ্যে ফেরার উদ্দেশে প্যারিসের বিমানে ওঠেন।

কিন্তু এর মধ্যেই তার নাগরিকত্ব প্রমাণপত্র রেসিডেন্স কার্ড হারিয়ে যায়। রেসিডেন্স কার্ড হারিয়ে গেলেও নাগরিকত্ব সম্পর্কিত তার অন্যান্য নথিপত্র ছিল। বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনে এসব নথি দেখালেও তাকে বেরোনোর অনুমতি দেয়া হয়নি।

আবদুলি বলেন, আমার অন্যান্য নথি নিয়েই চেক-ইনে যাই। কিন্তু তারা আমাকে বলে, রেসিডেন্স কার্ড ছাড়া তুমি বেরোতে পারবে না। বিষয়টি সমাধানের জন্য তাকে বিমানবন্দর থানায় নিয়ে যাওয়া হয়। কিন্তু পুলিশও বিষয়টি সমাধান করতে ব্যর্থ হয়।

এরপর প্যারিসে ব্রিটিশ দূতাবাস ও গাম্বিয়া দূতাবাসেও যোগাযোগ করেন আবদুলি। কিন্তু কেউই তাকে সাহায্য করেনি বলে জানান তিনি। এভাবে কয়েকদিন কেটে যাওয়ার পর অবশেষে রিচার্ড নেলসন এলএলপি নামে এক ব্রিটিশ আইনি পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে সক্ষম হন আবদুলি। পরামর্শক প্রতিষ্ঠানটি তার মামলাটি লড়বে বলে জানায়।

শুরু হয় আইনি লড়াই। লড়াইয়ে অংশ নেন রিচার্ড নেলসন এলএলপির অন্যতম আইনি পরামর্শক বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত সজিব হোসেন। প্রায় দুই সপ্তাহ পর ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ আবদুলিকে যুক্তরাজ্যে ফেরার অনুমতি দিতে সম্মত হয়।

বিষয়টি নিয়ে সজিব হোসেন বলেন, আবদুলি বিমানবন্দরে আটকা পড়ার কয়েকদিন পর তার মামলাটি আমাদের কাছে আসে। আমরা তার ব্যাপারে খুবই উদ্বিগ্ন ছিলাম। সজিব আরও বলেন, ‘তাকে আরও আগেই ছেড়ে দেয়া উচিত ছিল। কিন্তু ব্রিটিশ অভিবাসন অফিসের অসহযোগিতার কারণে আবদুলির বের হতে অনেক সময় লেগেছে। এর ফলে অনেক মানসিক পীড়ার মধ্যদিয়ে যেতে হয়েছে তাকে।’

১৪ দিন পর অবশেষে বিমাবন্দরের ভয়ংকর সেই পরিস্থিতি থেকে মুক্তি পান আবদুলি। এরপর স্থানীয় সংবাদ মাধ্যম বার্মিংহাম লাইভকে এক সাক্ষাৎকারে নিজের সঙ্গে ঘটে যাওয়া ভয়ংকর সেই অভিজ্ঞতা ভাগাভাগি করেন তিনি।

তিনি জানান, বিমানবন্দরে আটকা পড়ার পর যতদিন পকেটে টাকা ছিল, ততদিন খেয়েছেন। কিন্তু কয়েকদিন পরই তার টাকা শেষ হয়ে যায়। ফলে শেষদিনগুলো না খেয়েই থাকতে হয়েছিল।

আবদুলি আরও জানান, এর মধ্যে তার ছেলের জন্মদিন চলে আসে। এরপরও তাকে বিমানবন্দর থেকে বের হতে দেয়া হয়নি। আবদুলির কথায়, ‘আমি যেন একটা কারাগারে আটকা পড়েছিলাম। গোসল করতে পারিনি। দাত ব্রাশ করার সুযোগ হয়নি।’

আবদুলি তার কষ্টের কথা বলতে থাকেন। বলেন, ‘বিমানবন্দরে বহু মানুষের আনাগোনা সত্ত্বেও আমি কারও কাছে যেতে পারিনি। কারণ আমার শরীর থেকে কটু গন্ধ বের হচ্ছিল। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে থাকত। হয়তো মনে মনে বলত, এ লোকটা এখানে কী করছে।’

বিমানবন্দরে আটকা থাকার পুরোটা সময় নিজেকে নিঃসঙ্গ, একাকি আর অসহায় মনে হয়েছে বলে জানান আবদুলি। বলেন, আমার নিজেকে খুবই অসহায় লাগত। কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই। মনে হত, কোনো কিছুই আমার নয়।

ফ্রান্সে আটকা পড়া যুক্তরাজ্যের স্থায়ী নাগরিককে উদ্ধার করে প্রসংশিত বাংলাদেশি আইনজীবী সজিব হোসেন

Leave a Reply

Your email address will not be published.

error: Content is protected !!